ধর্ষণের ঘটনাকে রাজনৈতিকীকরণ: প্রকৃত ন্যায়বিচারের পথে বাধা, মন্তব্য রুমিন ফারহানার
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ৪ জুন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে 'রাজনীতিকরণের এক ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রতিটি অপরাধের যন্ত্রণা, কষ্ট এবং এর প্রভাব সমান হলেও, কিছু ঘটনা অতিরিক্ত আলোচনা লাভ করে এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়, যা প্রকৃত ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে 'আর না+' নামক নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী নাগরিক উদ্যোগের আয়োজনে এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। ঈদুল আজহার পূর্বে গত ২৪ মে শাহবাগে এক প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল।
রুমিন ফারহানা পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত এক মাসে অন্তত ১১৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশ ভুক্তভোগীই শিশু। তবে, পল্লবীর ঘটনাটিকে এতটাই রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হয়েছে যে, কেবল দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাই ঘটনাস্থলে যাননি, এমনকি ভুক্তভোগী শিশুর বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানেও দুই দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ওই ঘটনার পর আরও অনেক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও সেগুলোতে এমন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়নি। তার মতে, বিচারের আওতায় আনতে হলে কোনো ঘটনাকে অতি আলোচিত হতে হবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করতে হবে এবং ব্যাপক জনআলোচনা তৈরি হতে হবে—তবেই রাজনৈতিক মহলের টনক নড়বে এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই প্রবণতাকে তিনি 'চেরি-পিকিং' আখ্যা দিয়ে বলেন, ১০০টি ঘটনার মধ্যে একটি অতিরিক্ত মনোযোগ পায়, বাকি ৯৯টি হারিয়ে যায়। তিনি সতর্ক করে দেন যে, যতদিন পর্যন্ত ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হবে এবং রাজনৈতিকভাবে বিচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত সত্যিকারের আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
আলোচনায় সুস্থ যৌনশিক্ষা বিষয়ক সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ধর্ষণের যে পরিসংখ্যান আমরা দেখি, তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র; অনেক ঘটনা কখনোই প্রকাশ্যে আসে না। এ বিষয়ে পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। শিশুদের 'ভালো স্পর্শ' ও 'খারাপ স্পর্শ' সম্পর্কে শেখানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের বুঝতে হবে যে, যৌন হয়রানি অন্যান্য অপরাধের মতোই একটি ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের জন্য দায়ী কেবল অপরাধী, ভুক্তভোগী নন। এই শিক্ষা ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই পরিবার থেকে দিতে হবে, অর্থাৎ সচেতনতা পরিবারের ভেতর থেকেই তৈরি হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এই সচেতনতা পরিবার থেকে শুরু হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া দরকার।
ধর্ষণের ঘটনায় আপস-মীমাংসার চেষ্টার প্রবণতা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, বিচার বিভাগ যদি আরও সক্রিয়, নারীবান্ধব ও ভুক্তভোগীবান্ধব হয়, তবে বাংলাদেশ আরও নিরাপদ ও উন্নত হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা মুশফিক উস সালেহীন গোলটেবিল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন। এতে আরও বক্তব্য দেন চিকিৎসক ও এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেত্রী উমামা ফাতেমা, নেটওয়ার্ক ফল পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্লাস্টের কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার, গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ এবং প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হক।




আপনার মতামত লিখুন