তোফায়েল আহমেদের জানাজাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ভিডিওর অপব্যবহার ও বিভ্রান্তি
কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিক্স
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ জোহরের নামাজের পর নিজ জেলা ভোলার মাটি তাঁকে শেষ আশ্রয় দিয়েছে, যেখানে জানাজা শেষে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। তবে এই জানাজাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলোর সঙ্গে তোফায়েল আহমেদের জানাজা অথবা ভোলার ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
এরকম একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা সেনাবাহিনীর একটি গাড়িকে ধাওয়া করছে। এই ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে যে, তোফায়েল আহমেদের জানাজায় লোকজনকে বাধা দিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গাড়ি জনতার আক্রমণের শিকার হয়েছে। তবে যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাম্প্রতিক বা ভোলার কোনো ঘটনা নয়। এটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়িতে সংঘটিত ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময়ের দৃশ্য। ‘বাহান্ন নিউজ’-এর ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি ভিডিওর সঙ্গে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির মিল পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, পাহাড়ি এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে আন্দোলনের নেতা ক্যুনান চাকমাকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়ার চিত্র এটি।
সেই সময়ে খাগড়াছড়িতে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, বিক্ষোভ মিছিল এবং সড়ক অবরোধ নিয়ে জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। খাগড়াছড়ির স্থানীয় সাংবাদিক শাহ আলম নিশ্চিত করেছেন যে, ভিডিওটি খাগড়াছড়ি সদরের প্রধান সড়কে ধারণ করা হয়েছিল এবং এটি গত বছরের আন্দোলনের সময়কার ঘটনা। আজকের দিনে ভোলায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনতার সংঘর্ষের কোনো তথ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
একইভাবে, ফেসবুকে ২৬ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ‘তোফায়েল আহমেদের জানাজা ঘিরে রণক্ষেত্র ভোলা শহর।’ ভিডিওটিতে দেখা যায়, পুলিশ লাঠি হাতে কিছু মানুষকে ধাওয়া করছে এবং তারা দৌড়ে পালাচ্ছে। যাচাই করে দেখা গেছে, এটি ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বরের ঘটনা। ঢাকা ট্রিবিউনের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত মূল ভিডিওতে উল্লেখ ছিল, এটি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ঝটিকা মিছিলে পুলিশের ধাওয়ার দৃশ্য। অর্থাৎ, পুরোনো একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিডিওকে তোফায়েল আহমেদের জানাজাকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে টুপি-পাঞ্জাবি পরা কয়েকজন ব্যক্তিকে হাতাহাতি করতে দেখা যায়। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘ভোলায় তোফায়েল আহমেদের জানাজায় রাস্তায় রাস্তায় সাধারণ মানুষকে আসতে বাধা দিচ্ছে জামায়াতের সন্ত্রাসীরা। একজন মৃত্যু মানুষকে নিয়ে সরকারের এত ভয়!! পুলিশ, বিএনপি, জামায়াত সবাই এক হয়ে মাঠে নেমেছে জানাজা করতে দেবে না।’ ভিডিওটির কয়েকটি কী-ফ্রেম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি অন্তত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে অনলাইনে রয়েছে। যাচাইয়ে জানা যায়, ঘটনাটি রাজধানীর জিয়া উদ্যানসংলগ্ন এলাকায় ঘটেছিল এবং এর সঙ্গে ভোলা বা তোফায়েল আহমেদের জানাজার কোনো সম্পর্ক নেই।
যেসব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এসব বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানো হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ’, ‘Shipon Islam’, ‘মিঠাপুকুর আওয়ামী লীগ পরিবার’, ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’, ‘আমি আওয়ামী লীগ’ এবং ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’ নামের অ্যাকাউন্টগুলো। এই অ্যাকাউন্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা নিয়মিত রাজনৈতিক প্রচারণামূলক ও বিভ্রান্তিকর তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করে। এর আগেও দেশের তথ্য-যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারিত একাধিক দাবিকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে শনাক্ত করেছে।




আপনার মতামত লিখুন